১৩ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং
Breaking::

Daily Archives: October 4, 2016

সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ভুয়া নয় প্রমাণ দিন: কংগ্রেস

indian-army-l

পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বিতর্কে এবার জড়লো খোদ কংগ্রেস। তাদের মতে, ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ যে ভুয়া নয় তার প্রমাণ দেয়া প্রয়োজন। কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মাধ্যমে ভারতের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের’ দাবি নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। এজন্য মিডিয়াকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যায় পাক সেনাবাহিনী।

কংগ্রেসের দাবি, এবার আর সময় নষ্ট না করে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের’ প্রমাণ দিয়ে পাকিস্তানের মুখ ভোঁতা করুক ভারত সরকার।

এছাড়া ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ নিয়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি রকমের প্রচারের অভিযোগও তুলেছে কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলেও পাকিস্তানে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করেছে ভারত। কিন্তু তা নিয়ে এতো ঢাকঢোল পেটানো হয়নি। তখন সামরিক সিদ্ধান্তেই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ হয়েছে।

কংগ্রেসের এই মন্তব্যকে সমর্থন করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান ও বর্তমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি কে সিং। এরআগে আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালও ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের’ দাবি পক্ষে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রমাণ উপস্থাপন করার দাবি জানিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত, কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের রণপ্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে যে বিষয়টি এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, সেটা হলো- পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’।

‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ সফল দাবি করে ঘটা করে সংবাদ সম্মেলন করেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী।

অন্যদিকে, বিষয়টি ‘ভিত্তিহীন’ প্রমাণে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে’র সাতটি স্পটের দুটিতে সাংবাদিকদের ঘুরিয়ে এনেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

সূত্র: জিনিউজ ইন্ডিয়া।

অবৈধ রাষ্ট্রপতিরা অবসর সুবিধা পাবেন না

%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a7%9f-%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%b8%e0%a6%a6%e0%a7%87

অবসরে যাওয়া রাষ্ট্রপতিদের ভাতা বাড়াতে জাতীয় সংসদে ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন-২০১৬’ নামে একটি বিল পাস করা হয়েছে। এই বিলের বিধান অনুযায়ী বর্তমানে একজন রাষ্ট্রপতি অবসরে গেলে ৪৫ হাজার ৯০০ টাকা ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তবে সর্বোচ্চ আদালত ঘোষিত অবৈধ রাষ্ট্রপতিরা এই সুবিধা পাবেন না।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী। এর বিরোধীতা করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্যরা। তারা ‘সর্বোচ্চ আদালত ঘোষিত অবৈধ রাষ্ট্রপতিরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন’ এই বিধানের রাখার বিষয়ে কঠোর আপত্তি জানান। একইসঙ্গে বিলটি সংশোধন, জনমত যাচাই-বাছাইর প্রস্তাব করেন। পরে তাদেও দাবি কণ্ঠভোটে নাকচ হলে বিলটি পাস করা হয়।

বিলটির উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসার জন্য জাতীয় পার্টি তিন বার সহযোগিতা করেছে। তাই তারা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সুযোগ সুবিধা কেড়ে নিতে পারেন না। তিনি আরো বলেন, শুধুমাত্র একজন রাষ্ট্রপতিকে টার্গেট করে বিলে এ ধরণের সংশোধনী আনা বাঞ্চনীয় নয়।

সিলেটের সেই ছাত্রীর অবস্থা আশঙ্কাজনক

00-110-58

সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের হামলায় গুরুতর আহত এমসি কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসের শরীরে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক

মঙ্গলবার (০৪ অক্টোবর) সাড়ে ৫টায় দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে অস্ত্রোপচার শেষ হয়।

অস্ত্রোপচার শেষে হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. এ এসএম রেজাউর সাত্তার (নিউরো সার্জন) বলেন, বিকেল সাড়ে ৫টায় অপারেশন শেষ হয়েছে এবং তাকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয়েছে। মেয়েটির অবস্থা সম্পর্কে আগামী ৭২ ঘণ্টার আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তার মাথা ও শরীরে অনেক কোপের জখম আছে

তিনি আরও বলেন, ৭২ ঘণ্টা পর নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবো। এটি যদি ঠিক থাকে তবেই তাকে অর্থোপেডিক্যাল চিকিৎসা দিতে হবে।

সোমবার (০৩ অক্টোবর) বিকেলে খাদিজা সিলেট এমসি কলেজের পরীক্ষা হল থেকে বের হওয়ার পথে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করেন ছাত্রলীগ নেতা বদরুল। এরপর গুরুতর অবস্থায় প্রথমে খাদিজাকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক দফা অস্ত্রোপচার শেষে রাতে তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে আনা হয়।

বিচারবর্হিভূত সব হত্যাকাণ্ডই অবৈধ

39402_1

‘‘শুধু অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় নয়, যে সময়ই বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড ঘটুক না কেন, সেটা অবৈধ৷” আর অবৈধ এ সব হত্যাকাণ্ডকে দায়মুক্তি দিয়ে বিগত সরকার যে আইন করেছিল, এবার সেটাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করল হাইকোর্ট৷

২০০২ সালের ১৬ই অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সেনাবাহিনী, তৎকালীন বিডিআর, পুলিশ, আনসার ও বেসরকারি প্রশাসনের সহায়তায় যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়৷ তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিধান, সন্ত্রাস দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য এই অভিযানের নির্দেশ দেয়৷

পরে ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যৌথ অভিযানের দায়মুক্তি দিয়ে সংসদে আইন পাশ করে সরকার৷ এরপর গত রবিবার হাইকোর্ট ওই দায়মুক্তিকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করে৷ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে সংবাদিকের মুখোমুখি হন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল৷

প্রশ্ন: এর আগেও কি কখনও এই ধরনের দায়মুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে?

সুলতানা কামাল: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরও একই ঘটনা ঘটেছিল৷ সেক্ষেত্রে হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল৷ পরে সেই দায়মুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করে আদালত৷ এরপর অবশ্য বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়৷ আর এক্ষেত্রেও ঐ একই ঘটনা ঘটেছে৷ এটা খুবই স্বাভাবিক যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আর দায়মুক্তি দেয়া যায় না৷ সেটা তো আইন বর্হিভূত, পাশাপাশি অসাংবিধানিকও বটে৷

উচ্চ আদালত সেই কাজটা করেছে৷ যার অর্থ, এখন ওই সময়কার ক্ষতিগ্রস্ত কেউ চাইলে বিচার চাইতে বা ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতে মামলা করতে পারেন৷

প্রশ্ন: এখনো তো দেশে বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড ঘটছে?

শুধু অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় নয়, যে কোনো বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডই অবৈধ৷ এখনো যেসব বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড ঘটছে সেগুলোও অবৈধ৷ আমরা হাজার বার বলছি যে, বিচারবির্হভূত হত্যাকাণ্ড ঘটা উচিত নয়৷ এটা ঘটতে দেয়াও উচিত নয়৷ একটি গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে চলতে পারে না৷ এর একটা শেষ হওয়া উচিত৷ আমরা এর অব্যহত প্রতিবাদ করছি৷ আমার মতে, সরকারকে এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে৷ এখানে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগও নেই৷

সূত্র: ডিডাব্লিউ

মোদির নির্বাচনী স্বার্থে সামরিক অ্যাকশন-গৌতম দাস

index

গত সপ্তাহে লিখেছিলাম মোদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে জনসভায় জানিয়েছেন, তিনি সামরিক যুদ্ধ বা এর প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিযোগিতা করতে চান না। কোন দেশ কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এর প্রতিযোগিতা করতে চান। এই প্রতিযোগিতার আহ্বান জনসভা থেকে তিনি পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশে রেখেছিলেন। অর্থাৎ প্রথমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গরম কথা বলে মোদি নিজ জনগণকে তাতিয়েছিলেন, শেষে কোঝিকোড়ে শহরের বক্তৃতায় সব উত্তেজনায় ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। স্পষ্ট করে বলেছিলেন যুদ্ধ নয়, তিনি উন্নয়ন চান। আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে তিনি যাবেন না। ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ কথার অর্থ কী, সেটাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। বলেছিলেন, পাকিস্তানকে তিনি ‘টেরোরিজমের’ অভিযোগে বড় প্রভাবশালী বা ছোট রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রচার চালিয়ে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মোদি সবশেষে যুদ্ধের দিকে যদি না-ই যাবেন, তিনি তা হলে গরম কথায় যুদ্ধের মতো হুমকি দিয়েছিলেন কেন?

মূল ইস্যু ছিল ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন। যেটা এখন প্রায় ৮০ দিনের বেশি টানা কারফিউর অধীনে চলছে। কাশ্মিরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। এ বিষয়ে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস সংগঠন দুই রাষ্ট্রের দুই কাশ্মির অংশেই সরেজমিন গিয়ে তদন্ত ও প্রত্যক্ষ দেখে যাচাই করে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাকিস্তান ও ভারত উভয় সরকারের কাছে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে অনুমতি চেয়েছিল। পাকিস্তান তৎক্ষণাৎ রাজি বলে জানালেও ভারত এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ওদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং তা মিডিয়ায় আসা শুরু করেছিল, ভারতের কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের এক মারাত্মক গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঘটেছে। এই ব্যর্থতার কারণেই কাশ্মিরের বহু জেলা শহর এখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিয়মিত আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা মোদি সরকারের কাছে এ বিপদের দিক তুলে ধরেছিল। আর প্রতিদিন ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী মিডিয়া এই ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছিল। পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার আগে জনগণের দৃষ্টি ও মিডিয়াকে কাশ্মির থেকে সরানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেছিলেন মোদি। তাই ভারতের উরির ব্যারাকে হামলায় ১৮ সেনা হত্যা, তা সে যেই ঘটাক, একে ইস্যু করে মোদি দৃষ্টি সরানোর কাজ করতে সফল হন। মিডিয়া ও জনগণ থেকে কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন বা লাগাতর কারফিউ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন হাওয়া হয়ে যায়। নতুন প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ আসন্ন কি না, আর পাকিস্তান থেকে আসা কথিত জঙ্গি হয়ে যায় মূল প্রসঙ্গ বা সব সমস্যার কারণ। এই দৃষ্টি ঘোরাতেই যুদ্ধের হুমকির গরম বক্তৃতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল মোদিকে।

কিন্তু ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় ম্যালেরিয়া হওয়াতে রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছে, কিন্তু এখন কুইনাইনের প্রভাব প্রতিক্রিয়ায় শরীরে ছেয়ে গেছে, তা কমানো হবে কী দিয়ে? বাজানো ও ঝড় তোলা যুদ্ধের দামামা এখন কমাবে কী দিয়ে? খোদ বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরাই নাখোশ, হতাশ হয়ে পড়েছে। সব দিক বিবেচনা শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে নেতাকর্মীদের হতাশার মধ্যেই সবার আগে পাবলিক বক্তৃতায় ‘যুদ্ধ নয়, উন্নয়ন চাই’ আর ‘কেবল কূটনীতি হবে চরম পদক্ষেপ’ বলে নিজের মূল অবস্থান পরিষ্কার ও প্রচার করে নেন মোদি। আর এর সাথে পরদিন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মোদি নিয়েছিলেন। এক হলো, সর্বদলীয় মানে সংসদের সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে ডাকা সভা থেকে নিজের ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে উপস্থিত সবার সমর্থন নিয়ে নেন তিনি। দুই. তিনি সব মিডিয়ার কাছে ওই নীতির পক্ষে সমর্থন চান। স্বভাবতই তা অন্তরালে। এটি এক কমন ফেনোমেনা এবং চর্চা যে ভারতের জাতীয় ইস্যুতে বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো আর সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা বা বিরোধিতা করে না। এবং সেই সাথে সব মিডিয়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রোপাগান্ডায় মেতে ওঠে। ফলে পরের দিন ২৫ সেপ্টেম্বর কেউ কেউ মোদির বক্তৃতার নেতি রিপোর্ট ও সমালোচনা করলেও ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতীয় মিডিয়া মোদির ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে অবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি একযোগে সামলে নিয়ে আসতে শুরু করে। দুই দিনের মাথায় বলা যায়, পরিস্থিতি মোদির পক্ষে ঘুরে যায়। এ কাজে মিডিয়া সাহায্য নেয় কয়েকটি ইস্যুর। এক. আগামী সার্ক সম্মেলনে একসাথে চার সদস্য দেশের যোগদানের অনীহা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। চার দেশের যোগ না দিতে অনীহার কারণ আলাদা; কিন্তু তা ভারতের কূটনৈতিক লবির কারণে একসাথে প্রকাশ হওয়াতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ভোটার কনস্টিটোয়েন্সির কাছে ব্যাপারটাকে ‘মোদির প্রতিশ্রুতি কাজ করছে’ এটা সাফল্য হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয় ভারতীয় মিডিয়া। এ ছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু ছিল, ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সিন্ধু নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি বাতিলের হুমকি। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় নদীর পানিবণ্টন বিরোধ মিটিয়ে এই চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিল এ দুই রাষ্ট্র। আসলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী মোট ছয়টি। ওই চুক্তিতে প্রতিটি রাষ্ট্র তিনটি করে নদী ভাগ করে নেয়, যাতে প্রতি তিন নদীর পানিপ্রবাহের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব এক এক রাষ্ট্রের। এভাবে ওই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছিল। উভয় পক্ষই এতে এত দিন খুশি ছিল, এখনো পানির পরিমাণ ও ভাগের দিক দিয়ে উভয়ই খুশি; কিন্তু একটি টেকনিক্যাল দিক আছে। তা হলো, ওই ছয়টি নদীরই উজানের দেশ হলো ভারত। অর্থাৎ ভাটির দেশ হলো পাকিস্তান। প্রথমে ভারত হয়ে, এরপর ওইসব নদী পাকিস্তানে প্রবেশ করে। ঠিক বাংলাদেশের মতো। ফলে নদীর পানিপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ করার ভূ-অবস্থানগত সুবিধা ভারতের পক্ষে। যদিও আন্তর্জাতিক নদী আইনে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভাটির দেশকে প্রাপ্য পানিবঞ্চিত করা বেআইনি। কিন্তু মোদি ব্যাপারটিকে অন্তত প্রোপাগান্ডায় নেয়ার জন্য ওই চুক্তিকে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করে দেখার জন্য সরকারি আমলা ও টেকনিক্যাল লোকদের প্রতি নির্দেশ জারি করেছেন। বাস্তবে ভারত এই চুক্তি ভঙ্গ ও অমান্য করবে কি না, বাঁধ অথবা কোনো বাধা তৈরি করবে কি না সেটা অনেক পরের ব্যাপার; কিন্তু ইতোমধ্যে মোদির ওই নির্দেশ ভারতীয় মিডিয়া ব্যাপক প্রচারে নিয়ে গেছে। ফলে সাধারণ ভারতীয়দের মনে মোদি যুদ্ধ করার উসকানি যতটা তাতিয়েছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে এতে। যদিও মিডিয়ার এক কোণে টেকনিক্যাল প্রকৌশলীরা মন্তব্য করেছেন, এই পানি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, কারণ এটি প্রবল খরস্রোতা ও খাড়া প্রবাহিত পাহাড়ি নদী। আবার পাকিস্তান থেকেও ওখানকার মিডিয়ায় পাল্টা হুঙ্কার দিয়ে বলা হয়েছে, বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তবে সুবিধা হলো, ভারতীয় মিডিয়া এ খবরটিকে দেশে তেমন প্রচারে নেয়নি। অবশ্য প্রথম দিন রাশিয়া-পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পূর্বনির্ধারিত এক যৌথ মহড়া এ সময়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল, আর তা যথাসময়েই শুরু হয় বলে এটাকে ভারতের জনগণের মন খারাপ করা খবর ও ভারতের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ভারতের মিডিয়া সেটি সফলভাবেই সামলে নেয়। অপর দিকে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা আরেক খবর ছাপে যে, লাহোরে চীনা অ্যাম্বাসির কনসাল জেনারেল পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই) সাথে দেখা করার সময় ভারত-পাকিস্তান বিরোধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে বলে জানিয়েছে। শাহবাজের তরফ থেকে বিবৃতির সূত্রে খবরটি ছাপা হয়। এই খবরটি পাক্কা দুই দিন টিকে থাকতে পেরেছিল। দুই দিন পরে চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের রেগুলার ব্রিফিংয়ে এমন খবর তাদের জানা নেই বলে জানায়। তবে এ বিষয়ে চীনের অবস্থান প্রকাশ করে। তা হলোÑ উভয় দেশ যেন সামরিক বিরোধে না জড়িয়ে বসে ডায়ালগে সমাধান খোঁজে, চীন এর আহ্বান জানায়। ভারতীয় মিডিয়া এ খবরটি ব্যাপক প্রচারে নিয়ে যাওয়াতে এটিও মোদির পক্ষে জনগণের সমর্থন আনতে সাহায্য করে মিডিয়া। শুধু তাই নয়, ভারতের মিডিয়ায় প্রচার শুরু করে যে, আমেরিকা ভারতের পক্ষে আছে। যেমন- আনন্দবাজারের এক খবরের শিরোনাম হলো, ‘চাপের মুখেও পাক তর্জন, মার্কিন প্রশাসন পাশে আছে ভারতের।’ কিন্তু এটাকে প্রোপাগান্ডা বলছি কেন? অথবা আসলেই চীন ও আমেরিকার ভারত-পাকিস্তান বিরোধে অবস্থান কী, কেন? আর সেটাই বা কত দিন থাকবে বা জেনুইন কি না? পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার সমস্যা হিসেবে কংগ্রেস নেতা, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কেরালার এমপি শশী থারুর তাকে উদ্ধৃত করে হংকংয়ের এক মিডিয়া জানাচ্ছে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা খুবই চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ এর মধ্যে জড়িয়ে আছে। আমেরিকার আফগানিস্তানের কারণে পাকিস্তানকে দরকার। চীন পাকিস্তানে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের এক একক বড় প্রকল্প নিয়েছে। যেটা দক্ষিণে বেলুচ সমুদ্রসীমায় এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে সেখান থেকে দক্ষিণ থেকে উত্তর অবধি পাকিস্তানের বুক চিরে এরপর চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, এমন সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এ বছর শেষে তা প্রথম পর্যায় শেষ করা হবে। উদ্দেশ্য, এই সড়ক চীনের একমাত্র মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের কাশগড় পর্যন্ত যাবে। এভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ভূমিবেষ্টিত এই প্রদেশকে সমুদ্র পর্যন্ত এক্সেস দেয়া, যাতে পণ্য আনা-নেয়া সহজ হয়ে যায়। এটা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নামে পরিচিত। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে চীন থেকে আলাদা করা সত্যিই কঠিন।

এ তো গেল দ্বিপক্ষীয় কারণ। এর চেয়েও বড় কারণ আছে- বৈশ্বিক অর্থনীতি। গত মাসে চীনে জি-২০ এর সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। জি-২০ মানে হলো, অর্থনীতির সাইজের দিক থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এমন ২০টি বড় অর্থনীতির দেশের সম্মেলন। উদ্দেশ্য গ্লোবাল অর্থনীতিতে কিছু কমন সাধারণ স্বার্থের দিক নিয়ে একমত হওয়া ও সিদ্ধান্ত নেয়া। যেমনÑ এবারের মূল ঐকমত্য হলো, গ্লোবাল মন্দা বিষয়ে। দুনিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ায় ১৯৩০ সালে প্রথম মহামন্দা আসে। মহামন্দার সারার্থ হলো, সব রাষ্ট্রের নিজ মুদ্রার মান-দাম কমিয়ে অন্যের ওপর বাজার সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে টিকে থাকার চেষ্টা। এই ঘটনার লেজ ধরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছিল, যা থেকে প্রতিকার হিসেবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম। এ প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো আবার যাতে মন্দা না হয় তা ঠেকানো। তবুও ২০০৭-০৮ সালে আবার মন্দা দেখা দিয়েছিল। আফগানিস্তান-ইরাকে যুদ্ধে গিয়ে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের বিপুল যুদ্ধ খরচের এই ভারসাম্যহীনতা থেকে এর জন্ম বলে মনে করা হয়। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিপুল অর্থ ঢেলে ব্যক্তি-কোম্পানিগুলোর ধস ঠেকায়। অথচ পশ্চিমের বাইরে চীন তখনো ডাবল ডিজিটের অর্থনীতি টেকাতে পেরেছিল, কারণ সে যুদ্ধের বাইরে। ফলে পশ্চিমাদের চোখে গ্লোবাল মন্দা ঠেকানোর ক্ষেত্রে চীনকে এক ত্রাতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। চীন টিকলে তার ছোঁয়া ও প্রভাবে পশ্চিম তার সঙ্কট কাটাতে সুবিধা পাবে তাই। মন্দা দুনিয়াজুড়ে ছেয়ে যেতে বাধা হবে চীন তাই। পশ্চিম সেই থেকে মন্দা একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ওদিকে গত দুই বছর চীনের অর্থনীতি নিচের দিকে; কিন্তু ইতোমধ্যে ভারতে আগের কংগ্রেস আমলে ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনীতি এবার মোদির আমলে এখনো উঠতির দিকে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিই উঠতির দিকে পশ্চিমের চোখে সে আকর্ষণীয় ও আদরের। অতএব কোনোভাবেই ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দা আবার ফিরে আসুক তা ঠেকাতে সবার মিলিত প্রচেষ্টাই এবারের জি-২০ এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল। ফলে সবাই মিলে প্রতিশ্রুতি ও সিদ্ধান্ত নেয়, সঙ্কটের মুখে নিজ মুদ্রার মান-দাম কমানো এমন পদক্ষেপের পথে কেউ যাবে না। এ কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের ফলাফলে তা গ্লোবাল অর্থনীতিকে ডুবিয়ে মন্দার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। অতএব এই বৈশ্বিক সাধারণ স্বার্থের কারণে বড় অর্থনীতির কোনো রাষ্ট্রই সম্ভাব্য এই যুদ্ধকে নিজের স্বার্থের বিপক্ষে, নিজের জন্য বিপদ হিসেবে দেখে। যেন বলতে চায়, যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন দেয়ার বা পাওয়ার এটা সময় নয়।

গ্লোবাল উদ্বেগ ও ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের এ দিকটি সম্পর্কে মোদির জানা, সবাই তাকে সতর্ক করেছে; কিন্তু তবুও মোদির কিছু একান্ত স্বার্থ আছে। একালে দলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চল শুরু হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় উত্তর প্রদেশে (সাথে পাঞ্জাবসহ আরো কয়েকটি) রাজ্য সরকারের নির্বাচন। এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মোদি বা বিজেপি এখানে হেরে গেলে এখান থেকেই নীতিশ-মমতার নেতৃত্বে আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর জোট গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পাকিস্তান ইস্যু হওয়ার সম্ভাবনা।

ওপরে লিখেছিলাম, মিডিয়াসহ মোদি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর তৃতীয়টি হলো খুবই সীমিত পর্যায়ে সামরিক অ্যাকশন, যাতে ভোটে মোদির মুখ রক্ষা হয়। এক কথায় বললে, ‘যুদ্ধ না উন্নয়ন আর কূটনীতি’ এই নীতির পক্ষে ভারতের মিডিয়া একযোগে দাঁড়িয়েছিল খুবই সফলভাবে। মানুষের মন থেকে যুদ্ধে না যাওয়ার পক্ষে আগের তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করে আনতে পেরেছিল; কিন্তু সম্ভবত সামরিকবাহিনীকে আগেই সীমিত হামলার কোনো পরিকল্পনা করে আনতে বলা হয়েছিল, যা তারা হাজির করেছিল মিডিয়ার তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করার পর। কিন্তু লোভে পড়ে, বাড়তি লাভের আশায় মোদি এই সামরিক অ্যাকশনের পক্ষে সম্মতি দিয়ে দেয়। এখন মূল্যায়ন বসলে দেখা যাবে, আগামী নির্বাচনে ভোটে সুবিধা দেয়ার কাজেই সামরিক বাহিনীর ওই পরিকল্পনা ব্যবহৃত হয়ে গেছে। বিশেষত যত ছোট দিয়ে শুরু হোক না কেন, এখন পাল্টাপাল্টি বড় থেকে আরো বড় হামলার দিকে দুই দেশ জড়িয়ে পড়বে। এ সম্ভাবনা প্রবল হবে। শেষে এটা যুদ্ধে না পরিণত হয়। যেটা তারা উভয়ে কেউ চায় না; কিন্তু সেখানেই গিয়ে পৌঁছবে। বিশেষ করে ভারত যে কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, ইচ্ছা না থাকলেও ভারতকে আরেক দফা হামলায় যেতে হবে। ভারত প্রথম হামলা করে মিডিয়াকে বীরদর্পে জানিয়েছিল, নিজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই পাকিস্তানের ‘অনেক’ ক্ষয়ক্ষতি করে দিয়ে এসেছে। যেন বলা হচ্ছিল, এখন ভারতের মিডিয়া মোদির পক্ষে নির্বাচনী ক্রেডিট বিতরণ করতে নেমে পড়তে পারে; কিন্তু সন্ধ্যা লাগতেই জানা গেল, এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে আটকা পড়ে আছে। অথচ তা জানা সত্ত্বেও ভারতীয় বাহিনীর নেতারা তা লুকিয়ে অস্বীকার করে রেখেছিলেন। এ ছাড়া যেটা এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা- দুই দেশের বাহিনীই এখন প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে ঢুকে গেছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ সত্যতা জানা প্রায় অসম্ভব। তবে কি পূর্ণ যুদ্ধের (পারমাণবিক বোমা পকেটে রেখে) দিকেই যাবে বা যাচ্ছে পরিস্থিতি? সেই সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। দুই পক্ষই তা না চাইলেও নিজ নিজ জনগণকে ‘ইজ্জত রক্ষার স্বার্থ’ দেখাতে গিয়ে পূর্ণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। যদি না মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীন-আমেরিকা যৌথভাবে এগিয়ে আসে। পুরনো ইতিহাস বলছে, মধ্যস্থতাকারীর কিছু ভূমিকা আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

সবর ও শোকর মহৎ গুণ

hand-raised

বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। অভাব-অনটন এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের নিত্যসঙ্গী। প্রতিনিয়ত আমরা অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করছি। অভাব-অনটনে ধৈর্য ধারণ করা রাসূলুল্লাহ সা:-এর মহান আদর্শ। রাসূলুল্লাহ সা:ও অভাব-অনটনের মধ্যে দিন গুজরান করতেন। মাসের পর মাস রাসূলের ঘরে আগুন জ্বলত না। রাসূল সা: দাওয়াতি কাজে দূর-দূরান্তে সফর করতেন। আর অভাব-অনটন তার সফরসঙ্গী হতো। একবারের ঘটনা, রাসূলুল্লাহ সা: বর্ণনা করেন, ‘আমি আর বেলাল সফরে বের হয়েছি। একাধারে তিন দিন চলে গেল। আমাদের সাথে প্রাণ বাঁচানোর মতো খাবার নেই, ওই যৎসামান্য খাবার ছাড়া; যা বেলাল বোগলের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল’ (তিরমিজি শরিফ)।

রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে প্রস্তাব করা হয়েছিল, ‘তুমি যদি চাও উহুদ পাহাড়কে স্বর্ণে পরিণত করে দেয়া হবে।’ রাসূল সা: বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি এটা চাই না। আমি চাই একদিন আহার করব আর তোমার শোকর আদায় করব। আরেক দিন অভুক্ত থাকব আর সবর করব।’ রাসূলের দোয়া ছিল এ রকম, ‘হে আল্লাহ! আমাকে গরিব অবস্থায় রাখো, গরিব অবস্থায়ই আমার মৃত্যু দান করো, গরিবদের সঙ্গেই আমার হাশর করো’ (ইবনে মাজাহ, তিরমিজি শরিফ)।

সবর ও শোকর এ দু’টি এমন মহৎগুণ, যা মানুষকে সরাসরি জান্নাতে পৌঁছে দেয়। সবরের দ্বারা মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা হয়। যেকোনো বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা মূলত আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজেকে চরমভাবে সোপর্দ করার নির্দেশ করে। তাই সবরের সাওয়াব অনেক বেশি। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘সবরের প্রতিদান হলো জান্নাত’ (সহিহ ইবনে খুজাইমা)। আরেকটি হলো শোকর। শোকর আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা নেয়ামত আরো বৃদ্ধি করে দেন। কুরআন কারিমে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি তোমরা আমার নেয়ামত পেয়ে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো, তাহলে নেয়ামত বৃদ্ধি করে দেবো। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তা হলে নেয়ামত ছিনিয়ে নেবো’ (সূরা ইবরাহিম : ৭)।
শোকর আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা বান্দাহর নেয়ামত বাড়িয়ে দেন। নেয়ামত বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বিভিন্ন রূপ হতে পারে। কখনো নেয়ামতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। কখনো নেয়ামতে বরকত দান করেন। যেমন সম্পদের পরিমাণ না বাড়িয়ে তাতে বরকত দান করে দেন। এ জন্যই অনেক দ্বীনদার শ্রেণিকে দেখা যায়, অল্প রোজগারে সুখ-শান্তি ও তৃপ্তির সাথে জীবনযাপন করছেন। তার মানে আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পদে বরকত দান করেছেন। আবার অনেককে দেখা যায়, সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেও সুখ নেই। আজ এই বিপদ, কাল ওই বিপদ। টেনশনের পর টেনশন। বাজে খাতে তার সম্পদ উড়ে যাচ্ছে। এর মানে হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছেন তবে তাতে বরকত দেননি।
রাসূলুল্লাহ সা: জীবনযাত্রার যে মান ছিল, আমাদের জীবনযাত্রার মান তার চেয়ে বহু গুণে উন্নত। তিনি হয়তো একটা খেজুর খেয়ে দিন গুজরান করেছেন। কখনো না খেয়ে থেকেছেন। কখনো হয়তো ঘরে রুটি তৈরি হয়েছে তো তরকারি নেই। এই ছিল দোজাহানের বাদশাহর জীবনযাত্রার মান। তার পরও তিনি সবর ও শোকর আদায় করেছেন। আর আমরা কত উন্নত জীবনযাপন করি। আমাদের মধ্যে যারা দিনমজুর তারাও পেট ভরে তিন বেলা ভাত খায়। আর অনেকে তো দিনে কত বেলা খাই হিসাব নেই।
সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা এই ছিল যে, যখন তাদের কাছে সম্পদ আসা শুরু হয়েছে তারা পেরেশান হয়ে যেতেন। না জানি ঈমান-আমলের বদলা দুনিয়াতে পেয়ে গেলাম নাকি? এ জন্যই হজরত আয়েশা রা:-এর জন্য যখন হজরত উমর রা. রাষ্ট্রীয় ভাতা চালু করে দিলেন, তখন তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমার কাছে দুনিয়া আসা শুরু করেছে। সুতরাং তুমি আমাকে তোমার কাছে উঠিয়ে নাও।’

সুতরাং অভাব-অনটনে ধৈর্যধারণ করা ও সচ্ছলতায় শোকর আদায় করা রাসূলুল্লাহ সা: সুন্নত। আমাদের প্রত্যেকের জন্য এই সুন্নত পালন করা জরুরি।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজীপুর।

অরুন্ধতি রায়ের দ্বিতীয় উপন্যাস

১৯৯৭ সালে প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পরই আলোচনায় চলে এসেছিলেন ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতি রায়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ সে বছর সম্মানজনক বুকার পুরস্কার জিতেছিল। তবে এর পর দীর্ঘ বিরতি।

২০ বছরের বিরতি শেষে অরুন্ধতি রায় ফিরছেন তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ নিয়ে। আগামী বছর উপন্যাসটি প্রকাশিত হবে বলে জানিয়েছেন অরুন্ধতি নিজেই। উপন্যাসটি প্রকাশ করবে হ্যামিশ হ্যামিল্টন ইউকে ও পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া। এ খবর জানিয়েছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান।

গতকাল সোমবার অরুন্ধতি রায় তাঁর নতুন বই প্রকাশের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “আমি খুবই খুশি যে ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এর পাগল আত্মারা পৃথিবীর মুখ দেখার সুযোগ খুঁজে পেয়েছে। এবং আমি একজন প্রকাশক খুঁজে পেয়েছি।”

অরুন্ধতি রায়ের লিটারারি এজেন্ট ডেভিড গডউইন বলেন, ‘শুধু অরুন্ধতির পক্ষেই এ ধরনের উপন্যাস লেখা সম্ভব। দারুণভাবে মৌলিক, যা লিখতে ২০ বছর সময় লেগেছে। এবং এই দীর্ঘ অপেক্ষা ভালো কিছুর জন্যই।’

হ্যামিশ হ্যামিল্টনের পাবলিশিং ডিরেক্টর সিম প্রোসের নতুন বইটি সম্পর্কে বলেন, ‘লেখা অসাধারণ এবং চরিত্রগুলোও। সতেজ, আনন্দে পরিপূর্ণ এবং উদার। অক্ষরগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে বইয়ের পাতায়।’

১৯৬১ সালের ২৪ নভেম্বর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে জন্ম অরুন্ধতি রায়ের। চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিয়ালের চিত্রনাট্য লেখার মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেন অরুন্ধতি রায়। ১৯৮৮ সালে ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’ ছবির চিত্রনাট্যের জন্য ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্রে পুরস্কারে সেরা চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার পান অরুন্ধতি।

১৯৯২ সালে নিজের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ লেখা শুরু করেন তিনি। উপন্যাসটি লেখা শেষ হয় ১৯৯৬ সালে। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে।

লেখালেখির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে অরুন্ধতি সব সময় সোচ্চার। বিশেষ করে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। গহিন জঙ্গলে গিয়ে থেকেছেন ভারতের মাওবাদী গেরিলাদের সঙ্গে, তাদের হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।

কবিতার সহিত অর্থের সম্বন্ধ

untitled5

একটা বিষয়ে আমি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের সহিত একমত। তিনি এক জায়গায় লিখিয়াছেন, ‘একটা কবিতার থেকে গুটিকয় লাইন তুলে দিলে কবিতাটির কোন পরিচয় দেয়া হয় না। কেননা একটা কবিতা তার অংশবিশেষের চমৎকারিত্বের উপর দাঁড়িয়ে যায় না। তাকে তার সবগুলি পংক্তির, সবগুলি শব্দের উপরে, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের উপরে, দাঁড়িয়ে থাকতে লাগে। এই সম্পর্কসূত্র ছিঁড়ে ফেললে যা থাকে তা একটা মালা থেকে খসিয়ে ফেলা এক বা একাধিক পুঁতি। আলাদাভাবে তাদের সৌন্দর্য কিছু থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু তাদের থেকে গোটা মালাটার ধারণা করা অসম্ভব।’ এই উদ্ধৃতিটির ভিতরের কথাগুলি খোদ লেখকের। আমি কিছু কিছু যতিচিহ্ন, দুয়েকটি বানান নিজের ভাষায় অনুবাদ করিয়া লইয়াছি মাত্র। পার্থক্যের মধ্যে এই যাহা। পাঠিকার স্বাধীনতা যাহাকে বলে আমি তাহা একটু লইতে বাধ্য হইয়াছি। আশা করি, লেখক ইহা লইয়া মোকদ্দমা ফাঁদিবেন না।

অগাস্টিন গোমেজ আমাদের অনেক অনুগ্রহ করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, ‘সবচেয়ে রূপসী নারীর দেহকেও খণ্ড খণ্ড করে, তার একটা আঙ্গুল কি চুল চোখ কি নখ প্রদর্শন করলে যা করা হয় তা ঐ রমণীকে এবং তার স্রষ্টাকে অপমান করবার নামান্তর।’ আহা, রমণী! তিনি অধিক গমন করিয়াছেন, ‘উদ্ধৃতিরসের রসিয়াদের এক অর্থে কাটা হাতপা প্রভৃতিতে রতিসুখলাভকারী স্যাডিস্টদের সঙ্গে তুলনা করা যায়।’ আহা, মারকি দো সাদ! এখানেই বিরতি লইব।

কবির উপদেশটি আমার বেশ কাজে লাগিয়াছে। আশা করি, দেশেরও লাগিবে। কবির কবিতা পড়া এক জিনিশ, তাহা লইয়া আলোচনা করিতে যাওয়া সম্পূর্ণ আর। আমাদের দেশে সাহিত্য—বিশেষ কবিতা—সমালোচনার মূলধারায় গোমেজ-কথিত ‘উদ্ধৃতিরসের রসিয়াদের’ রাজত্ব চলিতেছে এখনও। এদিকে অধীনের উপর আদেশ হইয়াছে গোমেজের কবিতা লইয়া দুই পাতা লিখিতে হইবে। কর্তব্যপালনে বিফল-মনোরথ হইতে বসিয়াছি, এমন সময় প্রত্যাদেশের ন্যায় উপরে যে উদ্ধৃতিরসের সঞ্চার করিয়াছি তাহা খাঁড়ার ন্যায় নাজেল হইল। তাই সাহস করিয়াছি। আমরাও কেন স্মরণীয় হইব না?

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের একটি কবিতা একদিন দৈবক্রমে পড়িয়াছিলাম। স্থির করিয়াছি অদ্য শুদ্ধমাত্র ঐ কবিতাটি লইয়াই আলোচনা করিব। কবিতাটির নাম ‘পথনির্দেশ’। গ্রন্থের নাম ‘ঝালিয়া’। রচনাকাল—লেখকের দয়ায় জানিয়াছি—২০০৩। কবিতাটি পড়িয়া মনে হইল কবি যাহা বলিতে চাহিয়াছেন তাহা কিন্তু বলেন নাই, অর্থাৎ বলিয়াই ক্ষান্ত হয়েন নাই। তাই এই কবিতাকে ‘অপরূপ কথা’ বা অ্যালেগরিও বলা যাইতে পারে। অপরূপ কথা আকারে পড়িলে ইহাকে বলা চলে সকল কবিতার অপরূপ কথা। শুদ্ধ কবিতার কেন, খোদ ভাষার।

আমি আগেভাগে পুরা কবিতাটিই তুলিয়া দিতেছি। তারপরে তাহার অর্থ লইয়া আলোচনা করিব। ‘পথনির্দেশ’ সত্য সত্যই পথনির্দেশের ভাব করিতেছে। ধরা যাইতে পারে পুরানা ঢাকায় যাইতেছেন, কাহিনীকার কহিতেছেন—

ধরো উয়ারিতে আছো, টিপু সুলতান

রোড ধরে চলিতেছ খ্রিস্টান-কবরস্তান পানে

তারপর যেখানে শেষ টিপু সুলতান

সেখানেই ঘুরে গিয়ে ডানে

হাঁটি হাঁটি পা পা যাও নারিন্দা মোড়ের দিকে তুমি,

মোড়ে গিয়ে, বেঁচে থাকলে, ঝুনুর দুয়েক প্লেট মোরগ পোলাও মেরে দিয়ে

ডান দিকে বয়ে যাও ধোলাই খালের তেরাস্তায়,

উঁহুহু ডানে ঘুরো না, নাক বরাবর হাঁটো কুলি আর কামিন খেদিয়ে

হৃষীকেশ দাস রোড ধরে। ডানে বায়ে একে একে

পেরোও পাঁচভাই ঘাট লেন আর বানিয়ানগর,

এবং কদমতলা, সেখানে কদমগাছ তলে

পিংকি এক মন্দির রয়েছে, সেটি এত পিচ্চি যেন রান্নাঘর

প্রণাম ঠুকিতে চাও ঠুকিয়া আগায়ে যাও গজ পঞ্চাশেক,

আবার তেমাথা, যেথা লক্ষ্মীবাজারের রাস্তাখানি

(ওরফে সুভাষ বোস অ্যাভিনিউ, সবারই অজানা সেই নাম)

মিলে গেছে হৃষীকেশে, বাকরখানির

দোকান আছয়ে সেথা…তবু চলে যাও সোজাসুজি

একরামপুর আর কলুটোলা ছাড়িয়ে দু’দিকে

তখন ডানদিকে তুমি দেখিবে হেমেন্দ্র দাস রোড

উক্ত রোডে লহো পা দু’টিকে

রিকশার বেতঝোপ ফুঁড়ে কনুইয়ে জানুতে

কয়েকটা মুদি ও লোহালক্কড়ের চক্করের পরে

কলাপসিবল গেটে পাঁচতলা গারদ

গোলাপি রঙ্গের বাড়িটিতে নক করে

আমাকে পাবে না ॥

আপনারা—যাঁহারা ধরা যায় জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়িয়া ধরাশায়ী—মনে করিতে পারেন কবিটি বেশ নাগরিক। আমরা—যাঁহারা পুরানা ঢাকার অলিন্দে নিলয়ে হাঁটিতে হাঁটিতে একদা পায়ের ধুলা মাথায় ঠুকিয়া লইতেছিলাম—তাহারাও বেশ ‘বাস্তববাদী’। ঢের মজাও পাইয়াছি এই কবিতা পড়িয়া। ঝুনুর দুয়েক প্লেট মোরগ পোলাও আমিও কয়েকবার না মারিয়া পারি নাই। নাক বরাবর কুলি আর কামিন খেদাইয়া আমিও দুই চারিবার হাঁটিয়াছি ধোলাই খালের তেরাস্তায়। একেবারে শেষ বিজোড় পংক্তিতে পৌঁছিয়া আপনার হুঁশ হইবে—আপনি ঠিক জায়গাতেই আসিয়াছেন কিন্তু যাহার সন্ধানে আসিয়াছেন তিনি বাড়ি নাই। এই হইল কবিতাখানি। ইহার সহিত বাকরখানির অর্থাৎ তাহার অর্থের কি সম্বন্ধ? সেই সম্বন্ধই এই কবিতার ‘অপরূপ কথা’।

শুদ্ধ কবিতা কেন? আমরা ইচ্ছা করিলে অধিকও যাইতে পারি। মানুষ বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। সে কথা বলে। তাহার অর্থ আছে। অর্থের মজায় সে পড়ে। কিন্তু সে অর্থ তাহাকে এড়ায়। মানুষের ভাষার সহিত একটা খোসাওয়ালা পিঁয়াজের তুলনা করা যায়। পিঁয়াজের একটা খোসা ছাড়াইলে ভিতরে আর একটা খোসা পাওয়া যায়। সেই খোসা ছাড়াইলে আরও এক খোসা। এইভাবে খোসাক্রমে শেষ খোসা। শেষ খোসার পর আর কি? আর নাই। কিছুই নাই। গোলাপি রঙ্গের বাড়ির মতন বাড়িটি আছে। তাহাকে ‘গারদ’ বলিয়া যতই রঙ্গ করেন না কেন আমি কিন্তু সেখানে নাই। আমি মরীচিকার মত হারাইয়া গিয়াছি ‘আমি নাই’। তারপরও আমিই তো কথা বলিতেছি। তো আমি কোথায় আছি? আমিই না পথনির্দেশ দিতেছি। আমি তোমার ভাষার মধ্যে—এই কবিতার মধ্যেই—আছি বৈকি!

আমি আমি নই—এই আমি সেই ‘আমি’ নই—বলিয়াই ‘পথনির্দেশ’ কবিতাটি একপ্রস্ত অপরূপ ভাষার কথা হইয়াছে। বিশেষ করিয়া ভাষার স্বভাব বিষয়ের কাহিনী এইখানে গা ঢাকা দিয়াছে। আপনি তাহা মানিয়া লইয়াছেন কিনা জানি না। আপনার মন পাইবার অভিলাষে আর একটু বয়ান করি। স্মরণ করি কবি কি ইশারা করিয়াছেন। প্রকাশ একই বছরে রচিত আরেক পাতা কবিতায়ও সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ একই অপরূপ কথা জাহির করিয়াছিলেন। ইহাতে যাঁহারা ইচ্ছা কবির কবিতা অপেক্ষা ‘কবিকে জানিতে পারিলে আরও গুরুতর লাভ’ মনে করেন তাঁহারা লাভের জিনিশ একটা পাইলেও পাইতে পারেন। আমার চোখ পুলিশ পুলিশ। আমি এখানেও এই এক অপরূপ কথাই শিকার করিব।

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ একদা যাহা লিখিয়াছিলেন তাহাতে স্বৈরাচারের যুগে বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস থোড়বড়ি আকারে লেখা হইয়াছে। তাহাতেই প্রকাশ তিনি সেখানে থাকিয়াও নাই। এখানে পিঁয়াজের খোসা নাই, রসুনের কোয়া পাওয়া যাইতেছে। স্বৈরাচারের যুগে বাংলাদেশের কবিতায় যে কলঙ্করেখা তাহার একটা দিগন্ত এখানে ধরা পড়িয়াছে। বাংলাদেশের বর্তমান কবিতা অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে মোগল রাজদরবারের কবিতার মতন পবিত্র পতিতা। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজকে তাই আমি মির তকি মিরের সহিত তুলিতে চাই।

ঝটপটাপট কবিতা ফাঁদতে হবে

গোটা দুচ্চার- তা না হলে সাজ্জাদ

রাইসু, মাসুদ খানকে কি হুনাতাম?

আসর করবো মাত অরা- আমি বাদ।

ধরে লওয়া যায়, আইবেন আলতাফ

ভাই, তাঁর যত পালিশ-চিকন কপি

লয়ে- আছে হের্‌ ফরহাদ মজহার,

সব আড্ডার অদ্বিতীয়ম টপিক!

ইঁহারা ইশারা করবেন-‘সুব্রত

কবিতা বলেন!’ লেকিন আমি যখন

গাইব- ‘ভাই গো, কবিতা নাই তো সঙ্গে-’

কত ভালো, আহা, করবেন তাঁরা মন!

খান হুনাবেন হীনম্মন্য করা

কয়েক দিস্তা, প্রায় নিস্তারহীন-

শক্তি ও জয়ও নাক গলাবেনে এসে,

শাওন খাইয়ে দিবেনে পরে পুড়িং

রাইসুর লগে বার হয়ে রাস্তায়

গাড়ি খুঁজবার ঝক্কির মাঝরাতে

মুখটা এমুন করে রাখমু রে আমি

যাতে মনে হয়, আমিও ছিলাম সাথে…

এই কবিতটির নাম ‘সাজ্জাদ শরিফের বাসায়/ কবিতা পাঠের আশায়’—এ কথা না বলিলেও চলিবে। ১৯৮৫ সালের কিছু আগে বা পরে যাঁহারা ঢাকাদেশে কবিতা লিখিতে বসিয়াছেন তাঁহাদের একাংশের কাহিনী এই পদ্যে ধরা পড়িয়াছে। আমি সেই কাহিনী পড়িবার জন্য সুব্রত অগাস্টিন পড়িব কেন? কবি পরিচয়ে সুব্রত নিঃসন্দেহে হুসাইন মুহম্মদ এরশাদের উপরে বিরাজ করিবেন তাহাতে সন্দেহ কি। স্বৈরাচারের যুগে জন্মিলেই আপনাকেও স্বৈরাচারে মজিতে হইবে—এমন কথা কেহ কখন বলিয়াছে?

মলাটের লিখন ললাটের মতন। না যাইবে খণ্ডন। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের জন্ম ১৯৬৫ সালের ৭ জানুয়ারি তারিখে, দক্ষিণ ঢাকার কলাকোপা-বান্দুরা নামক মোকামে। ঐশীবাণী অনুসারে, কবি হিশেবে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের আত্মপ্রকাশ ১৯৮০ সালের দশকের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে। আরও জানা গেল স্ত্রী মিনতি ও কন্যা টায়রাকে লইয়া ১৯৯৫ সাল হইতে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বাস করিতেছেন। তাঁহার কবিতা সংগ্রহ তিনি উৎসর্গ করিয়াছেন একের ভিতর দুই মানুষকে। একজনের নাম মিনতি। আরজনের নাম মুখে লইতে পারিতেছেন না। নিজের নামের আদ্যাক্ষর আর বঁধুয়ার নামের আদ্যাক্ষর—দুই মিলাইয়া সেই অপূর্ণ বাসনা তিনি গাঙ্গুড়ের জলে ভাসাইয়া দিয়াছেন। তাঁহার বাসনার নাম তুমি নও, সুমি॥

দোহাই

১. সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, ঝালিয়া (ঢাকা : ভাষাচিত্র, ২০০৯)।

২. — কবিতা সংগ্রহ (ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৬)।

৩. — ‘কামূত্থান পর্ব : অহেতু গুঞ্জনমালা’, লোক, বর্ষ ১৬, সংখ্যা ১৯ (সেপ্টেম্বর ২০১৫), পৃ. ৭৫-৮০।

গাদ্দার- হামিদ মীর

109120_116

বুরহান ওয়ানি বেঁচে থাকতে কখনোই এটা ভাবেননি যে, একদিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে তার নাম নেবেন, যার পরে পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে উত্তেজনা এতটাই বাড়বে যে, নয়াদিল্লিতে পাকিস্তানের নদীগুলোর পানি বন্ধ করার উপায় নিয়ে ভাবা হবে। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভায় একুশ বছর বয়সী কাশ্মিরি স্বাধীনতাকামী বুরহান ওয়ানিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা এবং তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার পর থেকেই ভারতের মিডিয়া তাদের সরকারকে পাকিস্তানের ওপর হামলার জন্য উৎসাহ জোগাচ্ছে। বারখা দত্তসহ বেশ কিছু ভারতীয় সাংবাদিকের বক্তব্য হলো, বুরহান ওয়ানি একজন সন্ত্রাসী, যিনি ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে লিপ্ত ছিলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘে একজন সন্ত্রাসীকে হিরো বানানোর চেষ্টা করেছেন। সুতরাং পাকিস্তানকে শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন।’ কিছু ভারতীয় টিভি চ্যানেলে বলা হয়েছে, যদি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আমাদের গাদ্দারদেরকেও হিরো বানানো হতে থাকে, তাহলে আমাদের পাকিস্তানের গাদ্দারদেরকেও হিরো বানানো উচিত। কয়েক দিন আগে জিও নিউজে আয়েশা এহতেশামের অনুষ্ঠানে ভারতীয় সাংবাদিক উমা শঙ্কর সিং জাতিসঙ্ঘে বুরহান ওয়ানির নাম নেয়ায় নওয়াজ শরিফকে সমালোচনার নিশানা বানিয়ে বলেন, পাকিস্তান প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের সহায়তা করছে। যখন জিজ্ঞাসা করলাম, জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবের আলোকে জম্মু-কাশ্মির একটি বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। আর ওই বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে বুরহান ওয়ানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করলে কেমন করে তিনি সন্ত্রাসী হন? আমার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পরিবর্তে উমা শঙ্কর সিং তর্কবিতর্ক শুরু করেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভগত সিং এক ইংরেজ পুলিশ অফিসারকে হত্যা করেছিলেন এবং অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন। তাকে ভারতে স্বাধীনতাকামী কেন বলা হয়? যদি ভগত সিং স্বাধীনতাকামী হন, তাহলে বুরহান ওয়ানিও স্বাধীনতাকামী। ভারতীয় সাংবাদিক লা-জওয়াব হয়ে গেলেন। তবে ওই ঘটনার পর কিছু পাকিস্তানি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, ভগত সিং কে ছিলেন? আর আপনি বুরহান ওয়ানিকে একজন অমুসলিমের সাথে কেন তুলনা করেছেন? একজন পুলিশ অফিসার বলেছেন, ভগত সিং তো গাদ্দার ছিলেন, আর বুরহান ওয়ানি হচ্ছেন কাশ্মিরের শহীদ। এ বাক্য শুনে আমি থ হয়ে গেলাম। এরপর বুরহান ওয়ানির বাবা মুজাফফর ওয়ানির একটি সাক্ষাৎকার দৃশ্যপটে এলে স্বস্তি পাই। তিনি বলেছেন, ইতিহাসে আমার ছেলেকেও ভগত সিংয়ের মতো স্বাধীনতাকামী হিসেবে স্মরণ করা হবে। মুজাফফর ওয়ানির পক্ষ থেকে ভগত সিংয়ের কথা উল্লেখের পর কিছু পাকিস্তানি অনুগ্রাহীর অবগতির জন্য এ আলোচনা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ভগত সিং কে ছিলেন, কেন তাকে গাদ্দার বলা হয়েছে? আজ আমি নিজের স্বল্প জ্ঞানানুযায়ী আপনাদের ‘গাদ্দার’ শব্দের প্রেক্ষাপট সম্বন্ধেও জানাতে চাই, কেননা কিছু মানুষ এই শব্দকে গালিতে পরিণত করেছে, অথচ ভগত সিংয়ের জন্য এই শব্দ ছিল বেশ সম্মানের, বেশ গৌরবের।

গাদ্দার শব্দ মূলত গাদার শব্দ থেকে এসেছে। গাদার অর্থ বিদ্রোহ। আর গাদ্দার অর্থ বিদ্রোহী। পাক-ভারত উপমহাদেশে ১৮৫৭ সালে গাদার শব্দ জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিল। ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৭ সালের গাদারে অংশগ্রহণকারীদের ‘গাদ্দার’ বলা শুরু করে। ১৯১৩ সালে বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত কিছু শিখ, হিন্দু ও মুসলমান ছাত্র আমেরিকার সানফ্রানসিসকোতে গাদার পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। গাদার পার্টি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল, অখণ্ড ভারতে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশরাজের অবসান। গাদার পার্টি সানফ্রানসিসকো থেকে সাপ্তাহিক গাদার নামে একটি পত্রিকা বের করেছিল। পরে তা শিখদের গুরুমুখী বর্ণমালাতেও প্রকাশ হতে থাকে। সাপ্তাহিক গাদারের শীর্ষদেশে স্পষ্টভাবে লেখা থাকত, ‘আঙরেজি রাজ কা দুশমন’ (ব্রিটিশরাজের শত্রু)। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে গাদার পার্টি ইংরেজদের বিরুদ্ধে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু শিক্ষক বারাকাতুল্লাহ ভুপালির মাধ্যমে কাবুল অধিবাসী, মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধির সাথে যোগাযোগ করে। ১৯১৫ সালে গাদার পার্টি এমনকি, প্রবাসী সরকার গঠন করে। ওই সরকারের প্রেসিডেন্ট বানানো হয় রাজা মহেন্দ্র প্রতাপকে, প্রধানমন্ত্রী বানানো হয় বারাকাতুল্লাহ ভুপালিকে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানানো হয় মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধিকে। গাদার পার্টির সদস্যরা আমেরিকা ও কানাডা থেকে হিন্দুস্তান আসেন এবং স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যের মধ্যে থাকা স্থানীয় সিপাহিদের বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। গাদার পার্টির নেতারা মিয়া মীর ও ফিরোজপুর এলাকার সেনাছাউনির ওপর আক্রমণ চালিয়ে অস্ত্র লুটের পরিকল্পনা করেন, যাতে সেই অস্ত্র দিয়ে দিল্লিকে আক্রমণ করা যায়। কিন্তু লাহোরে গাদার পার্টির গোপন কেন্দ্রে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে কারতার সিং, হাফেজ আবদুল্লাহ, হরনাম সিং শিয়ালকোটি ও বাবুরামসহ অনেককে গ্রেফতার করা হয়। ভগত সিংয়ের পিতা অজিত সিংও গাদার পার্টিতে যুক্ত ছিলেন। তাকেও গ্রেফতার করা হয়। কারতার সিং ও হাফেজ আবদুল্লাহ প্রমুখের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা চালিয়ে তাদের সবাইকে লাহোরের কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। গাদার পার্টির এসব বাহাদুর নেতা ভগত সিংয়ের কাছে আদর্শ ছিলেন। ভগত সিং ‘নওজোয়ান ভারত সভা’ গঠন করেন। এরপর ‘হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’-এ যোগ দিয়ে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শরিক হন। ১৯২৮ সালে ভগত সিং এক ইংরেজ পুলিশ অফিসারকে হত্যা করেন। ১৮ এপ্রিল, ১৯২৯ সালে ভগত সিং কেন্দ্রীয় অ্যাসেম্বলিতে দু’টি বোমা নিক্ষেপ করেন এবং ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ সেøাগান দেন। ওই সময় কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ অ্যাসেম্বলিতে উপস্থিত ছিলেন, তবে তিনি আক্রমণে আহত হননি। ভগত সিংকে গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে ভগত সিং অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। এ ব্যাপারে তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল ভগত সিংকে আদালতে উপস্থিত না করেই তার বিরুদ্ধে মোকদ্দমার শুনানি শুরু করে দেন। ১২ সেপ্টেম্বর, ১৯২৯ সালে কায়েদে আজম কেন্দ্রীয় অ্যাসেম্বলিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ভগত সিং যা করেছেন, তার সমর্থন করা যায় না। তবে ভাবা উচিত, তিনি এসব কেন করেছেন? তিনি ভগত সিংয়ের প্রতি অবিচারের নিন্দা জানান। কায়েদে আজম ভগত সিংকে স্বাধীনতাকামী আখ্যায়িত করেন। ওই সময় লাহোর হাইকোর্ট বার ভগত সিংয়ের বিরুদ্ধে মোকাদ্দমার শুনানি পরিচালনাকারী ট্রাইব্যুনালকে বেআইনি হিসেবে আখ্যায়িত করে। কেননা ট্রাইব্যুনাল থেকে এক মুসলমান বিচারপতিকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট বারের ওই বিবৃতিতে আল্লামা ইকবালও স্বাক্ষর করেছিলেন। ২৩ মার্চ, ১৯৩১ সালে ২৩ বছর বয়সী ভগত সিং ও তার সঙ্গীদের লাহোরে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এটা সেই বছর, যে বছর জম্মু-কাশ্মিরে স্বাধীনতা আন্দোলন শক্তি সঞ্চয় করে। ১৯৩১ সালের এপ্রিলে মুফতি মুহাম্মদ ইসহাক জম্মুর মিউনিসিপ্যাল পার্কে ঈদের খুতবা দিচ্ছিলেন। খুতবার সময় তিনি ফেরাউনের সমালোচনা করলে এক হিন্দু ইন্সপেক্টর তাকে খুতবা দানে বাধা দান করেন। এখান থেকেই বিরোধিতা শুরু। ওই বিরোধিতার বাতাস শ্রীনগর গিয়ে পৌঁছে। শ্রীনগরের জামে মসজিদে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেয়ায় যুবক আবদুল কাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। তাকেও ভগত সিংয়ের মতো গাদ্দার অভিহিত করা হয়েছিল। আবদুল কাদেরের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। ওই বিক্ষোভে ‘সারফুরুশি কি তামান্না আব হামারে দিল মেঁ হ্যায়’ (নির্ভীকতার আকাক্সক্ষা এখন আমাদের অন্তরে) সুর করে গাওয়া হতে থাকে। আবদুল কাদেরের বিরুদ্ধে মোকাদ্দমার শুনানি হয়েছিল শ্রীনগর কেন্দ্রীয় কারাগারে। ১৩ জুলাই, ১৯৩১ সালে কাশ্মিরিরা ওই কারাগারের বাইরে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণে ২২ জন কাশ্মিরি শহীদ হন। আর এভাবেই এই আন্দোলন শুরু হয়, যাকে আল্লামা ইকবাল ১৪ আগস্ট ১৯৩১, লাহোরের মোচি গেটের সমাবেশে স্বাধীনতা আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। মনে রাখবেন, পাকিস্তান সৃষ্টি হয় ১৯৪৭ সালে, আর কাশ্মিরিদের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয় ১৯৩১ সালে। ১৩ জুলাই আজো কাশ্মিরিরা ‘শহীদ দিবস’ পালন করেন।
ইংরেজ সরকার ভগত সিং ও আবদুল কাদেরের মতো স্বাধীনতাকামীদের ‘গাদ্দার’ বলেছে। তারা রাষ্ট্রের দুশমন ছিলেন না, বরং তারা নিজেদের দেশে বিদেশী দখলদারের বিরোধী ছিলেন। এরপর ইংরেজ বাহিনীর রেখে যাওয়া শিষ্যরা কাশ্মিরি নেতা মকবুল বাট ও আফজাল গুরুকে ‘গাদ্দার’ অভিহিত করে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। আজ ভারত সরকার এবং ভারতের মিডিয়া বুরহান ওয়ানিকে গাদ্দার ও সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করছে।

একটু ভাবুন, ২১ বছর বয়সী বুরহান ওয়ানি এবং ২৩ বছর বয়সী ভগত সিংয়ের মাঝে কী পার্থক্য রয়েছে? শুধু নাম ও সময়ের পার্থক্য। উভয়ে বিদেশী দখলদারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। দিল্লিতে বোমা নিক্ষেপকারী ভগত সিংয়ের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ওই দিন দূরে নয়, যে দিন পুলওয়ামা ও শ্রীনগরেও বুরহান ওয়ানির নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের এজেন্টরা সর্বযুগে আজাদি ও স্বাধীনতার পতাকাবাহীদের ‘গাদ্দার’ অভিহিত করে থাকে। অথচ ইতিহাস ওই গাদ্দারদের হিরো বানিয়ে দেয়। আর যারা তাদের গাদ্দার অভিহিত করে, তাদের দেশের শত্রু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়।

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ হতে
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com

ভারত আক্রান্ত হলে পাশে থাকবে বাংলাদেশ

maxresdefault

ভারত আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ তাদের পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে এক সংলাপে অংশ নিয়ে এ কথা জানান মন্ত্রী।

বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত এই সংলাপে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে। তাদের সহায়তায় বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছে। বর্তমানে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মোকাবিলায়ও ভারত বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশ যখন যে সহযোগিতা চায়, ভারত তা দেয়। তাই ভারত যদি কোনোভাবে আক্রান্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশ তাদের পাশে থাকবে।

বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজের প্রসঙ্গ টেনে এক সাংবাদিক জানতে চান, যদি দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধ লাগে, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে এবং সীমান্ত নিয়ে বাংলাদেশের কী প্রস্তুতি রয়েছে?

জবাবে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে। এই দুই দেশের কোনো সীমান্ত সংযোগ নেই। একাত্তর সালে পাকিস্তানকে পরাজিত করে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এখন তাদের হাঁকডাকে কিছু যায়-আসে না।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে পাকিস্তান কথা বলায় সার্ক সম্মেলনও বর্জন করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ভারত বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম দেশ। তারা বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে প্রত্যাশা অনুযায়ী সহায়তা দিয়ে আসছে।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে—সে সম্পর্কে ভারতের সাংবাদিকরাও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তাঁদেরও জানানো হয়েছে, ভারত আক্রান্ত হলে পাশে থাকবে বাংলাদেশ।

বিএসআরএফের সভাপতি শ্যামল সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে অন্যদের মধ্যে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান এবং প্রধান তথ্য কর্মকতা এ কে এম শামীম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।